অজানা পথে পৃথিবী

এবং ডেস্ক : ‘পাল ছেঁড়া হাল ভাঙা তরী কোথায় কোন ঘাটে ভিড়বে তা কে জানে!’ বহুদিন আগের একটি বাংলা সিনেমায় সংলাপ। খুব মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, ২০২০ সালে এসে পৃথিবীটাও পাল ছেঁড়া হাল ভাঙা তরীর মতো হয়ে গেছে। বর্তমান পৃথিবীর মানুষের জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনীতি, মানবিক মূল্যবোধ সামজিক আচরণের প্রচলিত ধারা ভেঙেচুরে নতুন কোনো ধারায় পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সারা বিশ্ব। প্রতিদিন কোভিড-১৯ নামক অসুখে মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এ করোনাভাইরাসের আগ্রাসন মানুষের কাছে এখনও অপ্রতিরোধ্য, সরকারপ্রধান থেকে সাধারণ মানুষ, উঁচু-নিচু, এমনকি চিকিৎসাসেবায় যারা নিয়োজিত- কেউই বাদ যাচ্ছে না করোনার ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে। এর প্রভাবে পৃথিবীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কর্মজীবী মানুষ এ মুহূর্তে ঘরে বসা।

পৃথিবীর অধিকাংশ কলকারখানা বন্ধ। বিশ্বের অর্থনীতিতে এটি একটি বিরাট আঘাত। ভেঙে পড়তে পারে বিভিন্ন দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো। আবার কবে কখন কীভাবে ফিরে যাবে কর্মজীবী মানুষ তার কর্মস্থলে, কে জানে! কবে কখন আবার গণপরিবহন চলবে, বিমান উড়বে আকাশে তা কেউ জানে না। এ মুহূর্তে পৃথিবীর প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, কবে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে কেউ তা জানে না।

এ অনিশ্চয়তা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না যাওয়ার অভ্যাস, পাঠ্যপুস্তক না পড়া, শ্রেণি উত্তরণের পরীক্ষা না থাকায় এখনই অনেক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। করোনার এ সংক্রমণ প্রক্রিয়াকে যদি প্রতিরোধ করা না যায় তাহলে বর্তমানে প্রচলিত ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শিক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি কি চালু থাকবে? কী হবে আমরা কেউ জানি না, তবে এটুকু জানি করোনাভাইরাস প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বিরাট আঘাত, পাল্টে দিতে পারে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে।

পৃথিবীর সব দেশেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্ব স্ব দেশের নাগরিকদের এখনও আইনের মধ্যে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। কোনো কোনো দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীও মাঠে নেমেছে। কিন্তু এভাবে কতদিন? সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এ সংক্রমণ থেকে দূরে নেই। বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে তাদেরও মৃত্যু হচ্ছে।

অসুস্থ হয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করছে অনেকে। করোনাকে যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে কি এক সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে না? কেউ তা সঠিক করে বলতে পারবে না। শুনেছি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি স্বর্ণের দোকান লুট হয়েছে। অনেকেরই ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বল্পতার কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে।

মানুষে মানুষে দেখা-সাক্ষাতে ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানানোর জন্য একে অপরের সঙ্গে করমর্দন, কোলাকুলি, গালে গাল মিলিয়ে চুমু খাওয়া ছিল মানবসভ্যতার সংস্কৃতি। তা কি থাকবে? এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানুষে মানুষে দূরত্ব কি বেড়ে যাবে না?

আমার জানা একটি ঘটনার কথা বলতে পারি। এক পরিবারের এক মহিলা সদস্য করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তাদের পাঁচ বছরের শিশুসন্তান তার পিতাকে বলেছে- বাবা, মাকে আমাদের কাছে আসতে দিও না, ওর কাছে ভাইরাস আছে। ধীরে ধীরে কি ভেঙে যাবে না পারিবারিক বন্ধন? মায়ের মৃত্যুতে ছেলে পাশে থাকতে পারছে না। যে মেয়েটি তার স্বামীকে বিয়ে হওয়ার আগে বলেছিল, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, সেই স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী পাশে থাকছে না।

এমনকি বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর শেষ দেখাও দেখতে পারছে না তাদের প্রিয় সন্তানেরা। এমন চলতে থাকলে মানুষ নিশ্চয়ই আত্মকেন্দ্রিক হতে থাকবে। অবক্ষয় হবে মানবিক মূল্যবোধের। ধনীরা গরিবদের ত্রাণ দিচ্ছেন। কিন্তু কতদিন? ক্ষুধা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। ক্ষুধার তাড়নায় যদি মানুষ এক সময় আইনশৃঙ্খলার বন্ধন ছিঁড়ে বের হয়ে যায়? যদি ভেঙে যায় প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা? এ মুহূর্তে কেউ কিছু বলতে পারছে না।

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকার কথা বলা হচ্ছে, তাতে এ ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত স্টেডিয়ামে বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে কি আর খেলাধুলা হবে? আর কি চালু হবে সিনেমা হলগুলো? বিয়ে এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের বিশাল আয়োজন করে কি হবে কোনো উৎসব? কেউ জানে না।

আমার বয়স চুয়াত্তর চলছে। হার্ট, কিডনি, ডায়াবেটিস, নিউরোসহ শরীরে এখন অনেক সমস্যা। করোনা না হলেও হয়তো আর বেশিদিন পৃথিবী দেখা হবে না। জীবনের এই শেষ মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ কেমন পৃথিবী দেখে গেলাম?

এ মুহূর্তে যা দেখছি তা এক পাল ছেঁড়া হাল ভাঙা তরীর মতো কোথায় কোন ঘাটে ভিড়বে, কেউ জানে না। যারা ধর্মে বিশ্বাস করে তারা তাদের প্রভু ও দেব-দেবতার কাছে প্রার্থনা করছে অনতিবিলম্বে যেন পৃথিবী করোনামুক্ত হয়। আমি যেহেতু ধর্মে বিশ্বাস করি, তাই করোনা মুক্তির দায়িত্ব প্রভুর ওপরই ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ যেন মানুষের মধ্যে এমন কোনো উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে দেন, যা দিয়ে মানুষ করোনাভাইরাসকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। তিলে তিলে গড়া এই মানবসভ্যতার যেন কোনো ধরনের ক্ষতি করতে না পারে এ ভয়াবহ করোনাভাইরাস।কাজী হায়াৎ : চলচ্চিত্র পরিচালক

ট্যাগ্স
আরো দেখুন

এই সম্মন্ধীয় সংবাদ

Leave a Reply

Close