জামায়াতকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিল প্রদান বন্ধের আহ্বান

এবং ডেস্ক : জামায়াতে ইসলামীকে চরমপন্থী সংগঠন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে সংগঠনটিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিল প্রদান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘দি ডেইলি ওয়্যার’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই আহ্বান জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০১৬ এবং ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘দি ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা’ (আইসিএনএ) ‘ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি ফর ডিজাস্টার রিলিফ’ (এফইএমএডিআরডব্লিউ) থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার অর্থ পেয়েছে।

এতে বলা হয়, আইসিএনএ ও আল খিদমত ফাউন্ডেশনের মত এর সহযোগী সংগঠনগুলো পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারিত্ব হয়েছে। এই আল খিদমত ফিলিস্তিনের সংগঠন হামাসকে তহবিল যুগিয়ে থাকে। কাশ্মীরি জিহাদী গ্রুপ হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে আল খিদমতের প্রেসিডেন্ট হাফিজ নাইমুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদক ‘ইসলামিস্ট ওয়াচ’-এর পরিচালক স্যাম ওয়েসট্রপ এর মতে, আইসিএনএ ‘হেল্পিং হ্যান্ড ফর রিলিফ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামের আন্তর্জাতিক সাহায্য শাখা পরিচালনা করে, যার সঙ্গে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা নামক সংগঠনের সরাসরি অংশীদারিত্ব রয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক অপর এক জামায়াতী দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘মুসলিম এইড’ শুধু ২০১৩ সালেই ‘ফুড ফর পিস’ কর্মসূচির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের কাছ থেকে ১৫ লাখ ডলার অর্থ সহায়তা পেয়েছে। এই ‘মুসলিম এইডের’ প্রতিষ্ঠাতা চৌধুরী মাইন উদ্দিনকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ২০১৩ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে এই সংগঠনের একটি ফান্ডরেইজিং অফিসও রয়েছে।

প্রতিবেদনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইন্ডিয়ানা থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান জিম ব্যাংকস কর্তৃক ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটিতে উত্থাপিত ১৬০ নম্বর বিলটিকে স্বাগত জানানো হয়।

ওই বিলে আইসিএনএসহ মৌলবাদী জামায়াতি নেটওয়াকের্র যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগীদের সরকারি তহবিলের অবসান চাওয়া হয়। বিলে আইইসিএনএ-এর মত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তহবিল গ্রহণকারী সংগঠনগুলোর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নেতৃত্বের অংশীদার এবং সরাসরি সংযুক্ত হওয়া; জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে বারবার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান এবং আহমদী মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যলঘুদের ওপর আক্রমণ; জামায়াতে ইসলামী এবং এর অঙ্গসংগঠনসহ মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থহানী; পাকিস্তানের পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসেরের হত্যার সমর্থন করা এবং হত্যাকারীর জানাজায় নেতৃত্ব দেয়া; ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে আসিয়া বিবিকে মুক্তির বিরোধিতা করা; আল কয়েদা ও তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা; দক্ষিণ এশিয়ায় উদার গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রতি অব্যাহত হুমকি ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া, জামায়াতে ইসলামী থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) দ্ব্যর্থহীনভাবে দূরত্ব বজায় রাখা সংক্রান্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাব এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে বিএনপির প্রতি বাংলাদেশি আইনজীবী এবং রাজনৈতিক নেতা কামাল হোসেনের আহ্বানের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের প্রসার রোধ করে মানবাধিকার রক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের মত বিষয়গুলোতে দেশটির সরকারের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে কাজ করতে; ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রতি চলমান হুমকি প্রত্যাখ্যান, ব্যাহত এবং ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে; জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হতে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাতে; আইসিএনএ, আইসিএনএ রিলিফ, হেলপিং হ্যান্ড ফর রিলিফ অ্যান্ড ডেভেলপমেনন্ট এবং মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকাসহ (মুনা) জামায়াতে ইসলামী এবং এর অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সংগঠনগুলোর সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে সকল অংশীদারিত্ব ও তহবিলের যোগান স্থগিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি), যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও অন্যান্য বিভাগকে বলতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পরিষদকে আইন পাশের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইসিএনএ গত ১৯-২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের ৪৪তম কনভেনশন আয়োজন করে। গত বছরের কনভেনশনে ২২ হাজার লোকের সমাগম হয় বলে এই সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

দি মিডল ইস্ট ফোরামের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন কন্ট্রাক্টর ও ধর্মীয় বিশ্বাসী দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে আসছে। ২০০৭ সালের পর থেকে ফেডারেল সরকার ৪১১টি অনুদান ও কন্ট্রাক্ট্রের মাধ্যমে ৬১টি ইসলামী প্রতিষ্ঠানকে ৪৭ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে।

এতে বলা হয়,তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে– মৌলবাদী ইসলামিক আন্দোলনগুলো মুসলিম সংগঠনগুলোর ৩৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যারা মোট তহবিলের ৪২ শতাংশ পেয়ে থাকে। আরও ৩৬ শতাংশ ফান্ডগ্রহীতা বিভিন্নভাবে মৌলবাদী প্রভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে, যারা ৪৪ শতাংশ তহবিল পেয়ে থাকে। আর মাত্র ১৪ শতাংশ সরকারি তহবিল ওই সকল মুসলিম সংগঠনগুলোকে দেয়া হয়, যাদের উপর মৌলবাদীদের কোনো প্রভাব নেই।

মিশরের ব্রাদারহুড, দক্ষিণ এশিয়ার মৌলবাদী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী (একটি দক্ষিণ এশিয়ান মৌলবাদী আন্দোলন), সালাফি, দেওবন্দী, ইরানি প্রশাসন এবং অন্যান্যদের কমপক্ষে ৪১ মিলিয়ন ডলার সরকারি তহবিল প্রদান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনগুলোকে তহবিল দেওয়া কমেনি, বরং বেড়েছে। গত ২০১৮ সালে ৪০টি অনুদান ও কনট্রাক্ট্রের মাধ্যমে ১৩ মিলিয়ন ডলার এমন সংগঠনগুলোকে দেওয়া হয়েছে, যারা মৌলবাদী আন্দোলন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত। এর দু’বছর আগে ওবামা প্রশাসনের সময়ে ৩৫টি অনুদানের মাধ্যমে মাত্র ৩.৬ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল।

ট্যাগ্স
আরো দেখুন

এই সম্মন্ধীয় সংবাদ

Leave a Reply

Close